ক্যাসেটের ফিতেয় জড়িয়ে ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন’

এখনই শেয়ার করুন

তখন ৯০-এর শেষ। ক্যাসেট তখনও আছে। বাড়িতে আছে অদ্ভুত সব বাংলা-হিন্দি গানের কালেকশন। সেখান থেকে যা ইচ্ছে শোনার অধিকার আছে ছোটদের। প্রায় অনেক ক্যাসেট পেরিয়ে একদিন কানের দরজায় দরাজ গলায় ধাক্কা দিল— ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন’।
সত্যিই তো, গঙ্গা বইছে কেন? তখন একথার অলঙ্কার বুঝিনি। তবে বৈজ্ঞানিক কিছু প্রশ্ন ডানা বেঁধেছিল নিশ্চয়ই। ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন?’—  এ প্রশ্ন জাগা কি অস্বাভাবিক?

ভূপেন হাজারিকা— যিনি গায়ক, গীতিকার, কবি এবং পরিচালক। ওঁর গানের কথা অসাধারণ শিক্ষা, বিপ্লব ও দর্শনের কথা দিয়ে ভরা, মুক্তর মালার মতো। অহমিয়া, বাংলা অথবা হিন্দি ভাষার গানের মধ্যে সব থেকে বেশি আমরা বাংলাই শুনেছি। তবে যেভাবে আমরা ছোটবেলায় শেখার জন্যে সব কিছু সুর করে পড়তাম, ঠিক তেমনভাবেই যদি কেউ উচিত কথা সঠিক সুরের সাথে যুক্ত করে গান তৈরি করতে পারেন, সে গান মানুষের জন্য অতুলনীয়। গানের মধ্য দিয়েই নৈতিকতা, শিক্ষা মানুষের মাঝে আরও সরলভাবে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে এভাবেই।

‘গালিবের শের তাশখন্দের মিনারে বসে শুনেছি
মার্ক টোয়েনের সমাধিতে বসে গোর্কির কথা বলেছি’

—গানের নাম ‘আমি এক যাযাবর’। সত্যিই তো মানুষটা যাযাবর ছিলেন। দেশেবিদেশে ওঁর আনাগোনা ছিল অনর্গল। গান নিয়ে ছুটে যাওয়া। অসমের এক প্রান্ত থেকে দেশবিদেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মাটির গন্ধ নিয়ে ফিরেছেন।
‘অটোয়ার থেকে অস্ট্রিয়া হয়ে প্যারিসের ধূলো মেখেছি/ আমি ইলোরার থেকে রং নিয়ে দূরে শিকাগো শহরে দিয়েছি’— একটা শিল্পী প্রকৃতির প্রেমে পড়ে বিভিন্ন শহরে প্রান্তরে মিশে যাচ্ছেন। এক শহরের রং অন্য শহরে মিশিয়ে দেখছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা আর দর্শন থেকে যে কথাগুলো উঠে আসছে— ‘প্রেমহীন ভালবাসা বেসে বেসে, ভেঙেছি সুখের ঘর/ পথের মানুষ আপন হয়েছে, আপন হয়েছে পর / আমি এক যাযাবর’। এমন কঠিন কথা কীভাবে সহজে বলা যায়, এই গানটাই যেন প্রমাণ। এমন অজস্র গান আছে, যেগুলোর কথা বলতে গেলে হয়তো দীর্ঘ হতে পারে এই লেখা। এই সময়ে দাঁড়িয়ে বলা যায়, জীবনমুখী গানের বীজ হয়তো পোঁতা হয়ে ছিল এই সব গানে।

বলাই বাহুল্য, একটা সময় ছিল, যখন সবধরণের মানুষ বিদেশি গানের অনুরাগী ছিল না। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের নাম শুনলেই এখনও অনেকেই নাক সিঁটকোয় ৷ সেই সময় গান অনুবাদ করা এবং সেই গান মানুষের মন জয় করে নিচ্ছে এই ভাবনাটা বিরল। তবে করে দেখিয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা।

‘But ol’ man river/  He’s rolling along’  অথবা ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন’— পল রবিনসনের গান প্রথম বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ভূপেন হাজারিকা। ভূপেন হাজারিকা আর পল রবিনসন খুবই ভাল বন্ধু ছিলেন। বিদেশে পল হলিউড থেকে বিতাড়িত আর তার বর্ণবিদ্বেষ বিদ্রোহ গান, শিল্পমহলে গ্রহণ করার মতো ক্ষমতা অনেকেরই ছিল না। সেই সময় ভূপেন হাজারিকা পলকে একদিন বলেছিলেন— ‘মাঝে মাঝে এসে আপনাকে বিরক্ত করা যাবে?’ পল সম্মতি জানিয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু হয় ওঁদের বন্ধুত্ব, শিল্পের বন্ধুত্ব। শুরু হয় দর্শন ও চিন্তা ভাবনার আদানপ্রদান।

এখনও অনেকেই আছেন, অনুবাদ গান নিয়ে নানান অভিযোগ তোলেন। অনেকে তো শিল্পীকে ‘চোর’ও বলেন। কিন্তু একথাও মিথ্যে নয়, ওঁরা অনুবাদ না করলে অধিকাংশ মানুষ অসাধারণ কিছু সৃষ্টি শোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকত। বাংলা ভাষায় অনুবাদের ইতিহাস প্রাচীন। প্রশ্ন তো এখানেই, সাহিত্য অনুবাদ হতে পারলে, গান কেন নয়?

বাংলা বিদ্রোহ কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান ছাড়াও সময়ে অসময়ে অনেক বিদ্রোহী গীতিকার উঠে এসেছেন। সময়ের সাথে গানের ভাষা বদলেছে, রূপক বদলেছে। তবে বিদ্রোহকে সময় ধরে রেখেছে। অর্থ, উপদেশ আর উদ্দেশ্য একই থাকবে। শিল্প কোনওদিন বদল আনতে পারে না, শুধু খুলে দিতে পারে সাধারণ মানুষের চোখ। বাকি লড়াইটা সবার নিজের নিজের। নিজেকেই লড়তে হবে।
শোনা যায়, কবীর সুমন ভূপেন হাজারিকার গানে অনুপ্রাণিত হয়েই জীবনমুখী গানের ধারা শুরু করেছিলেন। ভূপেন হাজারিকা জীবনমুখী গানের বীজের মতো। বাকি অনেক গান নিয়ে কথা বলা হল না। মাত্র দু’টো মাইলফলক তুলে ধরলাম সবার সামনে। এমন অনেক মাইলফলক রাখা আছে ভূপেন হাজারিকার জীবনে, যা দেখে পৌঁছে যাওয়া যায় শিল্পীর অন্দরমহলে।

এখানেই ক্যাসেটের ফিতে ফুরিয়ে এসেছে। আবার পাল্টে দিতে হবে অন্য পিঠে। যুগ-যুগ ঠিক এভাবেই পাল্টে যাবে, বয়স বাড়বে, বোঝার ক্ষমতায় বিরাট তফাৎ ধরা পড়বে৷ অর্থ বদলে যাবে বয়সের সাথে৷ তবে রেশ রয়ে যাবে— ‘ও-গঙ্গা-তুমি-বইছ কেন?’
পুরনো হবে না কখনও এ-প্রশ্ন। তবে উত্তর বদলে যাবে, বদলাতে থাকবে।


এখনই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *