ভক্তের চোখে ‘অনলাইন রূপম ইসলাম একক’: অভিনব চক্রবর্তী

পৃথিবীতে অনেক সমস্যা আছে, সেই সমস্যার মুখে আমাদের বারবার পড়তে হয়। সেই সমস্যাগুলো এড়িয়ে যেতে পারলে জীবনটা অনেক বেশি মসৃণ হয়ে যেতে পারে বলেই আমার ধারণা। কিন্তু সমস্যার দলে মাঝে মাঝে কিছু রঙিন সমস্যারও দেখা পাওয়া যায়। যাদের দেখে আমার মনে হয়, এদের কাছে টেনে নিলে আমি একটু যন্ত্রণা পাব ঠিকই, তবু সেই যন্ত্রণাযাপনের সুখটুকু আমার এই মুহূর্তে চাই। ঠিক যেমন ছোটবেলায় দাঁত পড়ে যাওয়ার আগে যন্ত্রণা হলে পেনসিল মুখে দিয়ে আলগা কামড় দিলে যন্ত্রণার অদ্ভুত এক যন্ত্রণা পাওয়া যেত, যা কিনা সেই যন্ত্রণাকে বাড়িয়ে দিত আরও খানিকটা, তেমনই আমার জীবনে আসে অল্প অল্প কলম ধরার সুযোগ এবং সর্বোপরি একটি অতিপ্রিয় অনুষ্ঠানের সম্ভাব্যরূপে শেষ হয়ে যাওয়ার খবর লিখতে বসা, এও এক যন্ত্রণাই বটে।

ভক্তের চোখে 'অনলাইন রূপম ইসলাম একক': অভিনব চক্রবর্তী

অনুষ্ঠান? না ভুল লিখেছি, ওটা আন্দোলন। আমি মনে করি সেই আন্দোলন, যে ‘আন্দোলনের শেষ থাকে না, থাকে শুধু শুরুয়াত’। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে ‘রূপম ইসলাম একক’ নিয়ে, যে অনুষ্ঠানকে ওঁর অনুগামীরা ‘আন্দোলন’ হিসেবেই দেখেছেন বরাবর। একটি অদ্ভুত প্রক্রিয়া এই একক আন্দোলন, যেখানে শিল্পী এবং দর্শক একই মঞ্চে বিরাজমান, একই উদ্দেশ্য নিয়ে সকলের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পদক্ষেপ, যা বাংলা গানের জগতে বিরল। সেই আন্দোলনের মুখে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল করোনা ভাইরাস। আমরা যাঁরা শেষবারের মতো প্রেক্ষাগৃহে ‘আমি যাই’ শুনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চোখ ভাসিয়েছিলাম, তাঁরা জানি, একঘর মানুষ একসঙ্গে কাঁদলে কেমন আওয়াজ হয়, কেমনভাবে প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে আমাদের চোখের জল বন্ধুর কাঁধে গড়িয়ে পড়ে। ভেজা চোখ আর থমথমে মুখ নিয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসে শ’খানেক মানুষ, কে কার জন্য কাঁদছে জানা নেই, তবু বিশ্বাস আছে, কান্না পেলে পাশের অপরিচিত মানুষটাও কাঁধ বাড়িয়ে দেবে। এটা আন্দোলন নয় বলতে চান? হয়তো সেই কাঁধগুলোর ভরসাতেই অনলাইন রূপম ইসলাম একক এসেছিল, আন্দোলনকে থামিয়ে না রেখে আরও খানিক এগিয়ে নিয়ে যেতে!

ভক্তের চোখে 'অনলাইন রূপম ইসলাম একক': অভিনব চক্রবর্তী

গত ৪ ডিসেম্বর, রাত সাড়ে আটটায় অনুষ্ঠিত হয় ‘রূপম ইসলাম একক’। রূপম এই অনুষ্ঠানেই ঘোষনা করেন তিনি এই অনলাইন একক আন্দোলনের যবনিকা টানতে চলেছেন খুব শিগগিরই, সম্ভবত এটিই শেষ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে তিনি আভাস দিলেন যে, কাঁধগুলোর উপরে ভরসা করে এই বিশাল আন্দোলনের নেতৃত্ব তিনি করছিলেন, হয়তো সেই কাঁধগুলো আজ আর নেই। যদি সেই মুষ্টিমেয় কয়েকটি কাঁধ ফিরে পাওয়া যায়, তবেই এই আন্দোলনকে একটি নতুন রূপরেখায় সঞ্চালিত করা সম্ভব হবে। বাস্তবে কোনও আন্দোলনই একা নেতৃত্বের দায়িত্বে চলতে পারে না। আমার কল্পনার পাঠশালায় যেমন শিক্ষক এবং ছাত্র দুই পক্ষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাঠশালার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেন, বাস্তবেও সেই একইভাবে একটি আন্দোলনকে চালিয়ে যেতে হয়।

আমার এই প্রসঙ্গে খুব মনে পড়ে যাচ্ছে গুপি-বাঘার কথা। বাংলার পাড়া-গাঁয়ের দু’টো ছেলে, যাঁদের গান-বাজনার শখ সাধারণ মানুষদের বড্ড অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল। অবাক কাণ্ড, সেই গান ভূতের রাজার ভাল লেগে যায় এবং সে দায়িত্ব নিয়ে এই দুই শিল্পীর হিতে বর দিয়ে বসেন গোটা তিনেক। কী কী বর? যেখানে খুশি যেতে পারা, দু’বেলা পেট ভরে খেতে পাওয়া এবং সকলে তাঁদের গানবাজনা মন দিয়ে শুনবে, এই ব্যাপারটা নিশ্চিত করে দেওয়া। ভূতের রাজার বর কাজে লাগিয়ে গুপি বাঘা মানুষের হিতে ওঁদের শিল্পকে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়ে ওঠে। একজন শিল্পী ভূতের রাজা.. থুড়ি তাঁর শ্রোতাদের কাছে আর কীই বা চাইতে পারেন? গুপি-বাঘার শ্রোতা ভূতের রাজা, বাস্তবে গুপি-বাঘাদের ভূতের রাজা খুঁজে পাওয়া কি সত্যিই এতটা মুশকিল? কেউ ভান করে ভূতের রাজা সেজে আছে কি? জানা নেই এইসব প্রশ্নের উত্তর। শুধু জানা আছে, শিল্পের দায় একা শিল্পীর নয়, সমগ্র মানবজাতির সেই দায়িত্ব।

ভক্তের চোখে 'অনলাইন রূপম ইসলাম একক': অভিনব চক্রবর্তী

রূপম জানিয়েছেন, শুধু একক অনুষ্ঠান নয়, ফসিল্‌স-ও আবার ফিরবে, প্রেক্ষাগৃহে এবং পুরনো রূপে। আমার আশঙ্কা সেই একক আন্দোলনে বাদ পড়বেন বেশ কিছু মানুষ, যাঁরা মনে প্রাণে চেয়েছিলেন আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। ওঁদের ফিরিয়ে আনতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ঠিক কতজনের আছে জানা নেই। হয়তো শিল্পী শেষ অনুষ্ঠানে এই হিসেবটাই কষছিলেন। প্রতিটি গানের মাঝেই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, আমরা কতটা ব্যর্থ হয়েছি, কতটা আমরা ভূতের রাজা হয়ে উঠতে পারিনি, ভান করে গেছি শুধু। আমাদের আন্দোলনের ক্ষীর হয়তো এখনও ‘জমেনি’।

আমার সম্পাদক আমার এই লেখাটি প্রকাশ করবেন ‘ভক্তের চোখে’ নামক একটি সিরিজে। আমার বরাবরই একটু আপত্তি ছিল ‘ভক্ত’ হতে। কিন্তু ভূতের রাজা যে কেউ একা একা হতে পারে না! আপাতত ভক্ত হয়েই থাকতে হচ্ছে, যতদিন না আবার সেই কাঁধগুলো আবার একে অপরের চোখের জল এর দায়িত্ব নিচ্ছে, ততদিন আমরা যন্ত্রণায় কামড় বসাব, আর আওড়াব— ‘জোট বাঁধো তৈরি হও’। তবে এই আন্দোলন থামছে না, আমাদের মস্তিষ্কে বিদ্রোহ চলছে, বিপ্লব আসন্ন। ততদিন আমাদের লিখন চলবে, ‘গিটারের ঝংকার ক্ষমতার উৎস’।

লিখেছেন অভিনব চক্রবর্তী

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: