ভবানীপুর সিমেট্রি: বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক সাক্ষী

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন: প্রিন্সেপ ঘাট থেকে বেরিয়ে দক্ষিণে এগিয়ে বাঁদিকে রেসকোর্স। ডান দিকে পিজি হাসপাতালকে রেখে একটু এগোতে ডান দিকে অধুনা ১৫ ডিএল (দেবেন্দ্র লাল) খান রোড, কলকাতা ২৭। পাশে ভবানীপুর সিমেট্রি। উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। ভিতরটা সুন্দর দেখার মত! এর বর্ননায় যাওয়ার আগে ফিরে যাব পুরনো কলকাতার একটা অধ্যায়ে।

ভবানীপুর সিমেট্রি: বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক সাক্ষী বিবিধ ডট ইন bibidho.in

নাটকের যেন জোয়ার লেগেছে! হিন্দু থিয়েটারের পাশাপাশি বাবু নবীনচন্দ্র বসুর বাড়িতে তৈরি হয়েছে থিয়েটর। পিছিয়ে নেই সাহেবরাও! আচমকা চৌরঙ্গী থিয়েটর আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেল। নাট্যপাগল এসথার লিচ গভর্নমেন্ট প্লেস ইস্ট ও ওয়াটারলু স্ট্রিটের সংযোগস্থলে একটা দ্বিতল বাড়ির একতলায় গুদাম সাফ করে ১৮৩৯ সালে তৈরি করলেন নাট্যঘর সাঁ সুঁসি। দোতলায় ছিল সেন্ট অ্যান্ড্রুজ লাইব্রেরি।

লিচের চোখে তখন অনেক স্বপ্ন। একটু বড় নাট্যগৃহ করতে হবে! বছরখানেক বাদে একটা জমি পেলেন ১০ পার্ক স্ট্রিটে। গ্রিক প্যারেনথোনেনের ধাঁচে তৈরি করালেন নাট্যগৃহ। ৬টি ডোরিক স্তম্ভ। ২০০ ফুট বাই ৫০ ফুটের হল। প্রায় ২৮ ফুট চওড়া মঞ্চ। কাজ শেষ হল ১৮৪০-এ। ১৮৪১-এর ৮ মার্চ মঞ্চস্থ হল প্রথম নাটক ’দি ওয়াইফ’। গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ড সহ গন্যমান্যরা এসেছিলেন!

নাট্যগৃহ করতে মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এত টাকা এল কোথা থেকে? অকল্যান্ড এবং প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর দিয়েছিলেন এক হাজার টাকা করে! সাহায্য করেছিলেন ইংলিশম্যান পত্রিকার সম্পাদক স্টকুয়েলর। মূল অর্থ জোগাড় হয় সম্পত্তি বন্ধক রেখে।

১৮৪৩-এর ২২ নভেম্বর এক অঘটন ঘটে গেল। নাটক চলছিল। আচমকা সাইড উইংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এসথার লিচের গাউনে আগুন ধরে গেল। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল তা। মারা গেলেন লিচ। বয়স মাত্র ৩৪। ভবানীপুরের এখানে সমাধিস্থ করা হল তাঁকে।

ভবানীপুর সিমেট্রি: বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক সাক্ষী বিবিধ ডট ইন bibidho.in

ভবানীপুরে নির্জন এই অঞ্চলে পুরোদস্তুর সমাধিস্থল তৈরি হয় অবশ্য আরও পরে, ১৮৬৪-তে। এটি মূলত প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃত সেনাদের সমাধিস্থল। ৯৫টি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (একটি দেহ ফোর্ট চিংড়িখালি থেকে আনা)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃত ৬১৭ জন ছাড়া এসথার লিচের মত ২৩৩ টি অসামরিক ব্যক্তির দেহ সেখানে চিরশয্যায় শায়িত।

ভবানীপুর সমাধিস্থলে বেশ কিছু দেহ স্থানান্তরিত হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়াম থেকে। ময়দান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে এই সমাধিস্থল তদারকির দায়িত্বে আছে কমনওয়েলথ গ্রেভ কমিশন। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট দিন কমিশনের তরফে শ্রদ্ধা জানানো হয় মৃতদের স্মৃতির প্রতি।

এই শহরের বুক থেকে কিছু সুর ফুরিয়ে আসছে এক এক করে। কিছু গল্প শেষ হয়ে আসছে। প্রবহমান সময়ের কিছু কিছু অংশ প্রতি মুহূর্তে অতীত হয়ে যাচ্ছে।ডেরা গাজি খাঁয়ে ফ্রাঙ্কের সমাধির পাশেও কি এমন ভাবে ফুলগাছ হয়ে আছে? সমাধিটা দেখে প্রথমে এই কথাটিই মনে হল। মনে পড়ে গেল প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ফুলের মূল্য গল্পটির কথা। ম্যাগির বহু কষ্টার্জিত শিলিং ফিরিয়ে দিয়ে সে দিন মিস্টার গুপ্ত বলতে পারেননি, “আমাদের দেশে ফুল যেখানে অজস্র পরিমাণে পাওয়া যায় পয়সা দিয়া কিনিতে হয় না।”

ভবানীপুর সিমেট্রি: বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক সাক্ষী বিবিধ ডট ইন bibidho.in

কলকাতায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নিহত সেনার সমাধিফলকের পাশে ফুলের গাছ দেখেই মনে পড়ে গেল ম্যাগির কথা, বছর তেরো-চোদ্দোর অ্যালিস মার্গারেট ক্লিফোর্ড। সামান্য আয়ের সেই মেয়েটি অতি কষ্টে রোজগার করা একটা শিলিং (এক পাউন্ডের ২০ ভাগের এক ভাগ বা ১২ পেনি) দিয়েছিল লেখকের হাতে, তাঁর ভাই ফ্রাঙ্কের সমাধিতে ফুল দেওয়ার জন্য।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে ১০০ বছর আগে, ১১ নভেম্বর। কলকাতা শহরে সেই বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের সমাধিস্থল রয়েছে আলিপুরের কাছে কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভসে। বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই এই সমাধিস্থল ছিল, তাই দুই বিশ্বযুদ্ধের জওয়ানদের মাঝে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন যোদ্ধা নন এমন অনেক ব্যক্তিও। রাসকিন বন্ডের পিতার সমাধিও রয়েছে এখানেই।
প্রতিটি ফলকে শুধু জওয়ানের নামই নয়, লেখা রয়েছে তিনি কোন রেজিমেন্টের, সেই পরিচয়ও। আর রয়েছে সেই রেজিমেন্টের মনোগ্রাম।

রয়্যাল ওয়ারউইকশায়ার রেজিমেন্টের মনোগ্রাম দেখে থমকে দাঁড়ালাম। ২৮৩ বছর আগে তৈরি হওয়া এই রেজিমেন্টের মনোগ্রামে রয়েছে এ দেশের কৃষ্ণসার মৃগ। লোগের সেই ম্যাসকটের নাম ববি। ম্যাগির দেওয়া সেই শিলিংটার সঙ্গে কোথাও যেন মিল খুঁজে পেলাম। শিলিংকেও তো সে দেশে চলতি কথায় বব বলে তো!

ভবানীপুর সিমেট্রি: বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক সাক্ষী বিবিধ ডট ইন bibidho.in

১৮৮১ সালে তৈরি হওয়া ইয়র্ক অ্যান্ড ল্যাঙ্কাস্টারের ক্যাপ-ব্যাজে রয়েছে বাঘ, মানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯১৮ সালের মার্চে যে উইমেন্স অকজিলিয়ারি ফোর্স তৈরি হয়েছিল, সেই ফোর্সের এক সেনাকর্মীর সমাধিও রয়েছে এই সমাধিস্থলে।

কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ভবানীপুর সেমেট্রির এই অংশটুকু। সমাধিস্থলটি সরকারি ভাবে ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত, তবে মূল ফটক দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে গেলে তার অনের আগের সমাধিফলকও দেখা যাবে ১৮৬৪ সালের আগেও এখানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমাধিস্থ করা হয়েছে। লিখিত ইতিহাস অনুযায়ী, ফোর্ট উইলিয়ামের ব্রিটিশ সেনাকর্মী ও তাঁদের পরিবারের লোকের জন্য ব্রিটিশ আমলে এই সমাধিক্ষেত্রটি ব্যবহার করা হত।

প্রথমে সামরিক ও অসামরিক বলে আলাদা জায়গা চিহ্নিত করা ছিল না, তবে ১৯৫৪ সালে ভবানীপুর সিমেট্রির একাংশ নির্দিষ্ট করা হয় যাঁরা দুই বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের জন্য। তাই এই অংশেও এমন অনেকের সমাধি রয়েছে যাঁরা যুদ্ধে প্রাণ দেননি। সমাধিফলকের ধরণ দেখলেই অবশ্য তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

ভবানীপুর সিমেট্রি: বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক সাক্ষী বিবিধ ডট ইন bibidho.in

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ৯৫ জন ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৬১৭ জন শেষ শয্যায় শায়িত রয়েছেন এখানে। খ্রিস্টান ছাড়াও হিন্দু ও মুসলমান জওয়ানের সমাধিও এখানে আছে। আর এই অংশে রয়েছে ২২৫টি অসামরিক সমাধি।

তাজমহলের মতো ঔজ্বল্য নেই এই সমাধিস্থলের, থাকার কথাও নয়। শুকনো ফুলের ভার, আবেগ, কোনও নেই কোনও সমাধিফলকের গায়ে। না জানা বীরগাথা আর বীরত্ব সম্বল করে চিরশয্যায় শায়িত রয়েছেন দেশের জন্য দেশ ছেড়ে দূরে পাড়ি দেওয়া ফ্রাঙ্কের মতো বীরেরা। হয়তো কোনও দিন ম্যাগির কোনও উত্তরসূরী এখানে এসে খুঁজে নেবেন কোনও ফ্রাঙ্ককে, তারপরে তাঁর সমাধির সামনে ফুল রেখে বাতি জ্বেলে দেবেন।

 

লেখা ও ছবি: সায়ন্তন মণ্ডল


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।