বাঙালির প্ল্যানচেট: বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন: ‘প্ল্যানচেট’ শব্দ টা শুনলেই খুব ছোটো থেকেই একটা অদ্ভুত থ্রিল অনুভব হয়, তাই না? কমবেশি আমরা সবাই ছোটবেলায় একবার না একবার চেষ্টা করেছি এইভাবে ভূত দর্শনের প্রচেষ্টা সার্থক করার, কারোর হয়েছে হয়তো, কারোর হয়নি, আমি সেই হয়নি’র দলে | তুতো ভাইবোনদের সাথে মিলে ঠাকুরদার ঘরে প্ল্যানচেট করতে গিয়ে একবার বকা খেতে হয়েছিল| (বাঙালির প্ল্যানচেট: বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর)

আরও পড়ুন: রোমহর্ষক ডাইরি: কেউ বলছে, কিছু হাসছে, কেউ হাসতে হাসতে কাঁদছে

এরকম অভিজ্ঞতা প্রায় অনেকেরই হয়েছে | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় কমবেশি প্ল্যানচেটের ব্যাপারে কৌতুহল পোষণ করতেন | বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তো রীতিমতো প্রেতচর্চা করতেন | ‘মাই রেমিনিসেন্স’ নামক বইটি তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘কৈলাশ নামের আমাদের এক পুরোনো কোষাধ্যক্ষ ছিলেন যিনি বেশ কৌতুকপ্রিয় মানুষ ছিলেন | তাঁর মৃত্যুর পরেও কৌতুক তাঁকে ছেড়ে যায়নি |

একসময় আমার বয়ঃজ্যেষ্ঠরা অন্য জগতের সাথে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে | একবার যখন বসেছিল তখন পেনসিলে কৈলাশের নাম লেখা হয় | আমরা জানতে চেয়েছিলাম ওনার বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে এবং ওনার উত্তর ছিলো ‘তোমরা এতো হীনমনস্ক কিভাবে হলে আমার মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইছো?’ এরপর আরো অনেক পরিস্থিতি এসেছে যখন রবীন্দ্রনাথ নিজে প্ল্যানচেটের সহায়তায় নিজের মৃত সন্তান, স্ত্রী এবং বৌদির সাথে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন |

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জোড়াসাঁকো শাখা গোষ্ঠীর অগাধ বিশ্বাস ছিলো প্ল্যানচেটের ব্যাপারে | ১৩০১ সালের আশ্বিন মাসে ভারতী পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় এক অদ্ভূত যন্ত্রের যার মাধ্যমে প্ল্যানচেট করে অন্য জগতের সাথে সংযোগ স্থাপন করার দাবি করা হয় | এই যন্ত্রের উদ্ভাবক ছিলেন শরৎচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং ঠিকানা দেওয়া ছিলো ১০৮, আপার চিতপুর রোড, গরানহাটা, ক্যালকাটা | যন্ত্রটির নির্ধারিত মূল্য ছিলো ২.৫০ পয়সা এবং অতিরিক্ত খরচ বাবদ আরো ৭৫ পয়সা | রবীন্দ্রনাথ এই যন্ত্রের নাম দেন প্রেত্মানিভা চক্রযান |

আরও পড়ুন: জীবনানন্দের উপন্যাসে মেটাফর: ‘বিভা’

রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন যে তিনি সেই যন্ত্রের দ্বারা মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন | মধুসূদনের যখন মৃত্যু হয় তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র বারো বছর, তবুও তাঁর পূর্ন স্বাধীনতা ছিলো বাড়ির বড়োদের সাথে প্ল্যানচেট প্রক্রিয়াতে যোগদান করার যা তাদের জোড়াসাঁকোর বাড়ি তে হতো | এরপর হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর সব বন্ধ হয়ে যায় কারণ তিনিই ঠাকুরবাড়ির এই প্ল্যানচেটের উদ্যোক্তা ছিলেন |

প্ল্যানচেটের জন্য প্রয়োজন অন্ধকার ঘর, মোমবাতি, একটা কাঠের টেবিল, পেনসিল, বিভিন্ন অক্ষর এবং সংখ্যা লেখা একটা কাগজ, একটা মুদ্রা | সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাধ্যম যে খুব নির্ভীক হবে সহজে ভয় পাবেনা কারণ নাহলে তার ক্ষতি হওয়া অবশ্যম্ভাবী না, তার মাধ্যমেই যোগাযোগ স্থাপন হবে অশরীরীর সাথে |

কখনও এরকম হওয়াও সম্ভব যখন একজনের আত্মার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের সময় অন্য ব্যক্তির আত্মাও তাকে অতিক্রম করে এসে যায় এবং সে ভয়ংকর ও হতে পারে আবার নাও হতে পারে | অনেক সময় এরা ক্ষতিও করতে পারে কারণ মৃত্যুর আগে ও পরে একজন ব্যক্তি যখন প্রেতাত্মা তে রূপান্তরিত হয় তখন তার পার্থিব স্বভাবের পরিবর্তন হওয়াও অস্বাভাবিক না | একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্রেতাত্মারা যখন আমাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করে তখন তারা বাইনারি কোডের মাধ্যমে যোগাযোগ করে | মাধ্যমের মধ্যে যখন প্রেতাত্মা ভর করে তখন সে উত্তর গুলো তাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় খাতার পাতায় | এরকম ভয়ংকর প্ল্যানচেটের কথা বাংলা কবিতায় পাওয়া যায়, যেমন বুদ্ধদেব বোসের কবিতা ‘সন্ধিলগ্ন’-তে সন্তানের তার মৃত মায়ের কাছে কাতর আর্জি একবার তার সামনে এসে দেখা দেওয়ার!

আরও পড়ুন: ‘প্রতিবাদ হোক সেন্স অফ হিউমারে’, হিজিবিজবিজ-এর অভিনব উদ্যোগ

এভাবেই বহুকাল ধরে দেশে বিদেশে চলে আসছে প্রেতচর্চা বা প্ল্যানচেট | অজানা কে জানার চেষ্টা মানুষের বহু প্রাচীন অভ্যাস এবং রহস্য সন্ধানী মানবজাতি বরাবরই পরলোক জীবন নিয়ে জানার কৌতুহল পোষণ করে এসেছে এবং আজও করে চলেছে | রোমহর্ষক বহু অভিজ্ঞতার সাক্ষী হিসেবে প্ল্যানচেট আজও সমানভাবে চর্চিত |

লিখলেন সায়নী বন্দ্যোপাধ্যায়।


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।