যেন সাক্ষাৎ আলিবাবা, সাইরেন বাজিয়ে বলেন ‘চিচিংফাঁক’

এখনই শেয়ার করুন

জাহাজের ক্যাপ্টেন যেন ‘আলিবাবা’! সাইরেন বাজিয়ে বলেন— চিচিংফাঁক। ব্যস, কেল্লাফতে। বিশাল হাঁ করে খুলে গেল আস্ত একটা সেতু। মাঝ বরাবর একেবারে দু’ ফাঁক। টানটান পিচ রাস্তা তখন আকাশমুখী। জাহাজ নিয়ে এগিয়ে চললেন ক্যাপ্টেন। টপকে যেতেই পুলিসের সাইরেন— চিচিংবন্ধ। হাঁ বন্ধ ব্রিজ। ফের ব্যস্ত শহর ছুটতে শুরু করল তার উপর। খিদিরপুর যেন একখণ্ড ‘আরব্য রজনী’। (যেন সাক্ষাৎ আলিবাবা , সাইরেন বাজিয়ে বলেন ‘চিচিংফাঁক’)
  যেন সাক্ষাৎ আলিবাবা, সাইরেন বাজিয়ে বলেন 'চিচিংফাঁক' বিবিধ ডট ইন bibidho
‘নিহারি’ শব্দের উৎস হল আরবীয় শব্দ ‘নাহার’, যার মানে সকাল। তাই নিহারি খেতে হয় প্রাতরাশে। এটির বিশেষত্ব হল, এর মশলা— যাকে গুঁড়ো বা কোটি মসালা বলে। এই মশলা সাধারণত গোপন রাখা হয়। কারণ মশলার দ্বারাই নিহারির গুণবিচার হয়। সারা রাত মাংস, হাড়, মশলা ও ঝোল বিশাল ডেকচির মুখ বন্ধ করে ঢিমে আঁচে রান্না করা হয়। হাড়ের রস ঝোলে মেশে বলে এটি খেলে শরীর গরম থাকে। কেউ বলে এর উৎপত্তি অওয়ধে (অযোধ্যা) হয়েছিল। সেখান থেকে কলকাতায় আসে, আবার কেউ বলেন দিল্লিতে। তবে এটি লখনউ, হায়দরাবাদ, দিল্লি এবং অবশ্যই কলকাতায় জনপ্রিয়। প্রত্যেক জায়গার মশলা আলাদা। কলকাতায় ব্রিটিশ আমলে ইংরেজরা এটি ডালপুরি দিয়ে খাওয়ার চল করেছিলেন। তবে কলকাতার মুসলিম সম্প্রদায় এটি একটি স্পেশাল তন্দুরি রুটি বা কুলচা দিয়ে খেতে পছন্দ করেন।
গল্পের পরে খাওয়ার পালা। বাখারখানি সঙ্গে বিফ ও গোট দু’রকম নিহারির ব্যবস্থাই ছিল। খেতে যে দু’টিই অত্যন্ত সুস্বাদু সে আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সঙ্গে নানখাটাই নামে একটি বিস্কুটও ছিল। খাবার সম্বন্ধে জানাশোনার সঙ্গে একটা ব্যাপার আবার নতুন করে শেখা হল এই দিনটি যে, কলকাতা্র মানুষ এমন একটি কম্যুনিটি, যারা খাবারের বিচার কেবল গুণ দিয়ে করেন, কে বা কোন সম্প্রদায় তৈরি করেছে তা দিয়ে নয়। শুধুমাত্র খিদিরপুর অঞ্চলেই হিন্দু, খ্রিস্টান ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বাস করছেন বহু দিন যাবত। যে জায়গাটিতে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল সে রাস্তার নাম মনসাতলা রো এবং ফেরার পথে মা মনসার মন্দিরটিও চোখে পড়েছিল। বেঁচে থাকুক আমার শহর এই নির্মল মন নিয়ে। অন্য কোনও রঙের কদর্য কালি কখনওই যেন না পড়ে এই শহরের বুকে।
যেন সাক্ষাৎ আলিবাবা, সাইরেন বাজিয়ে বলেন 'চিচিংফাঁক' বিবিধ ডট ইন bibidho
আগেই বলেছি, খাদ্যরসিক বাঙালির অভিধানে ‘নিহারি’ কথাটি বেশ স্বর্ণাক্ষরেই লেখা আছে। প্রধানত শীতকালীন এই স্ট্যু জাতীয় খাবারটি তৈরি হয় পশুর মাংস দিয়ে। শুধু পায়ের হাড় ও মাংস ব্যবহার করা হয়, কোনও কোনও জায়গায় তার সঙ্গে মগজ এবং জিহ্বাও ব্যবহারও হয়। শহরের দুই রন্ধনশিল্পী তালাত কাদরি ও মঞ্জিলাত ফতেমা এসেছিলেন ‘নাহারি’ সম্বন্ধে বিশদ জানাতে। তালাত রান্না শেখানও। মঞ্জিলাতকে মোটামুটি সারা কলকাতা বেশ এক ডাকেই চেনে। তিনি শুধুমাত্র নবাব ওয়াজেদ আলি শাহর বংশধর নন, তাঁর রেস্তরাঁ মঞ্জিলাতে খাওয়ার জন্য রীতিমতো মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়।
বাখরখানির ইতিহাস জানার আগে আর একটি খাদ্যজগতের শব্দের সঙ্গে একটু বেশি পরিচিত হলাম। শব্দটি হল দাস্তারখান। তুর্কী এই শব্দটির অর্থ হল টেবলক্লথ বা চৌকো কাপড়ের টুকরো, যেটি বিছিয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ, পরিবারের সকল সদস্য ও অতিথিদের জন্য খাবার পরিবেশন করেন। একত্রে খাওয়া এবং খাবারে প্রাচুর্য থাক বা দীনতা, সকলকে সমান ভাগের মর্যাদা দেওয়াই হল এই সুন্দর প্রথার উদ্দেশ্য। বলাই বাহুল্য, দাস্তারখান মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে।
যেন সাক্ষাৎ আলিবাবা, সাইরেন বাজিয়ে বলেন 'চিচিংফাঁক' বিবিধ ডট ইন bibidho
বাখরখানির ইতিহাসে যে একটি অম্লান প্রেমের গল্প লুকিয়ে আছে তা আমার একেবারেই অজানা ছিল। তবে বাখরখানি সম্পর্কে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য বোধহয় যে, এটির জন্ম বাংলার বুকে। সদস্য সাবির আহমেদ বিস্তারিত ইতিহাস দিলেও সংক্ষেপে বলতে  গেলে, ১৭০০ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ দেওয়ানি লাভ করে বাংলায় আসেন। সঙ্গে আনেন বালক আগা বাখর খানকে। অনেকে বলেন আগা তাঁর ছেলে ছিল। তবে এ বিষয়ে মতবিরোধ আছে। আগাকে তিনি ছেলের মতনই মানুষ করেন এবং শক্তিশালী ও সুপুরুষ আগা অচিরেই সৈন্যবাহিনীতে উচ্চ পদে আসীন হন। পরবর্তীকালে মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপন করেন। আগা তখন চট্টগ্রামে উচ্চপদে ছিলেন। এই সময়ে তিনি আরামবাগের (বর্তমান বাংলাদেশে) নর্তকী খনি বেগমের প্রেমে পড়েন। দু’জনের এই প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন আর এক প্রভাবশালী রাজসদস্যের পুত্র জয়িনুল খাঁ। জয়িনুল নানাভাবে খনিকে পাওয়ার চেষ্টায় বিফল হয়ে শেষে অপহরণ করলে আগা তাঁকে প্রবল বাধা দেন এবং জয়িনুল কিছুকাল গা ঢাকা দেন। গুজব রটে, জয়িনুলকে হত্যা করেছেন আগা। এই গুজবে জয়িনুলের বাবা শোকে উন্মত্ত হয়ে আগাকে গ্রেফতার করান। ন্যায়পরায়ণ মুর্শিদ আগাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বাঘের সঙ্গে খাঁচায় বন্দী রাখেন।
যেন সাক্ষাৎ আলিবাবা, সাইরেন বাজিয়ে বলেন 'চিচিংফাঁক' বিবিধ ডট ইন bibidho
আগা কিন্তু বাহুবলে বাঘকে হত্যা করে খাঁচা ভেঙে পালিয়ে যান। জয়িনুল ইতিমধ্যে ফিরে এসে আবার খনি বেগমকে নিয়ে এক গভীর জঙ্গলে আটকে রাখেন। খনি পালাতে গিয়ে একটি সাপের ছোবলে আক্রান্ত হন। শোনা যায় যে, আগা বাখর তখন খনিকে উদ্ধার করতেই আসছিলেন। দু’জনের পথে দেখা হয় এবং খনি বাখরের কোলে মাথা রেখেই মারা যান। পরবর্তীকালে আগা বাখর নানা সমাজসেবা মূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করেন। তিনি মুর্শিদের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। রন্ধনশালে নানা রান্না নিয়ে চর্চা করতে করতে তিনি একটি রুটি জাতীয় খাবার তৈরি করেন এবং সেটি বাখর ও খনির প্রেমের স্মৃতিস্বরূপ নাম দেন বাখরখানি। তিনি তাঁর এই আবিষ্কারকে রাজপরিবারের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাই বাংলাদেশের নানা অঞ্চল যেমন ঢাকা, বাখরগঞ্জ, বরিশাল প্রভৃতি জায়গায় বাখরখানি খুবই জনপ্রিয় খাবার হয়ে ওঠে। প্রেমের প্রভাব খাবারেও, প্রেমিক আগা বাখর ও প্রেমিকা খনি বেগমের নামাঙ্কিত বাখরখানি।
দ্বিতীয় হুগলি সেতুর পাশ দিয়ে গিয়ে একটা হালকা বাঁক। সেখানেই একসঙ্গে বসবাস হিন্দুদের আরাধ্য দেবতা শিব ও মুসলিমদের খোয়াজা খিজির পিরের। দুই ধর্মের সহাবস্থানে গড়ে উঠেছে কলকাতার আমদানি রফতানি ব্যবসার কেন্দ্র খিদিরপুর। কিন্তু কেন এই অঞ্চলের নাম হল খিদিরপুর? সেই ইতিহাস ঘাঁটতে গেলেই জানা যাচ্ছে দুই ধর্মাবলম্বী মানুষের বছরের পর বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করার ইতিহাস।
‘খিদিরপুর’ নামটির উৎসের সঙ্গে শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেন-এর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন রবার্ট কিড। তাঁর পুত্র জেমস কিড ১৮০৭ সালে এই অঞ্চলে একটি ডক প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত ভূকৈলাস রাজবংশের জমিতেই তৈরি হয় এই ডক। জেমস কিড-এর নামানুসারে জায়গাটির নাকি নামকরণ হয় ‘কিডারপুর’।
অন্য একটি মতে, মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী জলসাম্রাজ্য তথা দরিয়ার পিরের নাম খাজা খিজির। ফারসিতে যা ‘খিজির’ উচ্চারণ, আরবিতে তা ‘খিদ্‌র’। এই খাজা খিজির বা ‘খাজা খিদ্‌র’-এর নাম থেকেই নাকি এসেছে খিজিরপুর তথা খিদিরপুর। আবার আরবি ভাষা থেকে আসা ‘খিদির’ মানে সবুজ।
যেন সাক্ষাৎ আলিবাবা, সাইরেন বাজিয়ে বলেন 'চিচিংফাঁক' বিবিধ ডট ইন bibidho
গঙ্গা তীরবর্তী ওই অঞ্চলের সবুজ বনানী ও তৃণক্ষেত্র দেখে জায়গাটির নাম হয়েছে ‘খিদিরপুর’ এটি মোটেই কষ্টকল্পনা নয়, কেন না খিদিরপুরের পাশেই রয়েছে গার্ডেনরিচ। সবুজ গাছপালায় সমৃদ্ধ বাগানবাড়ির জন্য এই গার্ডেনরিচ একসময় ইংরেজ রাজপুরুষদের খুব প্রিয় জায়গা ছিল। তাই ‘খিদিরপুর’-এর আসল অর্থ হয়তো সবুজ বনানী ও তৃণক্ষেত্র সমৃদ্ধ নগর। আবার খয়েরের শুদ্ধ নাম হল ‘খদির’। খয়েরের ব্যবসা ছিল বলে হয়তো জায়গাটির নাম হয়েছে ‘খদিরপুর’।
খিদিরপুরের ব্যুপত্তিতে আর একটি বিষয় আছে। আরবি ভাষায় যা ‘খিঞ্জির’, বাংলায় তাকে বলে শুয়োর। গবেষক সুকুমার সেন লিখেছেন– ‘খিঞ্জিরপুর’ থেকেই নাকি এসেছে ‘খিদিরপুর’। অর্থাৎ একসময় গঙ্গা তীরবর্তী এই জায়গাটিতে শুয়োরের প্রাধান্য ছিল। ডক সংলগ্ন এলাকায় শুয়োরের প্রাচুর্য থাকা অসম্ভব কিছু নয়।
যেন সাক্ষাৎ আলিবাবা, সাইরেন বাজিয়ে বলেন ‘চিচিংফাঁক’
লেখা ও ছবি: সায়ন্তন মণ্ডল

এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।