বাংলা ভাষা কি বিলুপ্তির পথে?

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন: শামসুর রহমান লিখেছেন,

বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে ঝরে
রোদ , বারান্দায় লাগে জ্যোৎস্নর চন্দন ।
বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে
উদার গৈরিক মাঠে , খোলা পথে , উত্তাল নদীর
বাঁকে বাঁকে , নদীও নর্তকী হয়।

২১শে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, এইদিন ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলার মানুষেরা এই দিনটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করেন। শহীদ বেদীতে পুষ্প দান থেকে শুরু করে গান কবিতায় আবেগে ভেসে যায় দুই বাংলার মানুষ।কিন্তু এই দিনটি ছাড়া আমরা কি আদতে আমাদের বাংলা ভাষা নিয়ে ভাবিত? বাংলা ভাষা কি সংকটের মুখে নয়?এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দেখা যায় মাতৃভাষাভাষী সংখ্যা র নিরিখে বিশ্বে বাংলার স্থান পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ স্থানে। প্রথম স্থানে চিনা ভাষা, দ্বিতীয় স্থানে আছে স্পেনীয় ভাষা, ইংরেজি তৃতীয় স্থানে, চতুর্থে আরবি। পঞ্চম স্থান নিয়ে বাংলার লড়াই হিন্দির বিরুদ্ধে।

আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিষয়ক গবেষক ভাষাকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন: ১) বিপন্ন ভাষা ২) প্রায় বিপন্ন ভাষা ৩) নিরাপদ ভাষা। ২০০৭ সালে তিনি একটি তথ্যে জানান, যে ভাষা দৈনন্দিন কাজে বা মানুষের মুখে ব্যবহৃত হবে তাকে বলা হয় নিরাপদ ভাষা। ২০১০ সালে ‘আকা বো’ ভাষায় কথা বলা শেষতম মানুষ মারা গেলেন সিনিয়র বো।

১৮৫৮ সালে ইংরেজরা আন্দামানে উপনিবেশ গড়ে তোলার সময় বো উপজাতির মানুষের সংখ্যা ছিল ৫০০০ জন। বোয়া সিনিয়র মারা যাওয়ার সময়ে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৫২-তে, যাদের মধ্যে কেউ-ই এই ভাষায় কথা বলতে জানতেন না।সেই যন্ত্রনা বুকে নিয়েই সে বিদায় নিয়েছিলেন।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাষাবিজ্ঞানীরা আশঙ্কিত ভাষার বিলুপ্তি নিয়ে।সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় আমাদের দেশের প্রায় ৪০টিরও ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। কারণ মাত্র কয়েক হাজার মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন।

১৯৯৯, ২০০১, ২০১১ সালের জনগননা থেকে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় কথা বলা মানুষের শতকরা একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় ১৯৯৯ সালের তুলনায় হিন্দি ভাষী ছাড়া অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা শতকরা কমেছে। অর্থাৎ ধরা যায় যে তারা নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে কিংবা কথা বলতে পারে না।

ইউনেস্কোর তালিকা অনুযায়ী বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলির মধ্যে আন্দামান নিকোবর দীপপুঞ্জের জারওয়া, লুরো, মুয়োট,  গ্রেট আন্দামানিজ, ল্যামংসে,অনগে, সানেনো, সেন্টিলেজ, শম্পেন, পু এবং টাকাহানিনিং, মণিপুরের আমল, আকা, কইরেন, লামগাং, লাংগ্রং, পুরম এবং তারাও ভাষা, হিমাচল প্রদেশের  পাঙ্গভালি, বাঘাতি, হান্দুরি এবং সিরমাদিও ভাষা রয়েছে। অন্য ভাষাগুলির মধ্যে রয়েছে ওড়িশার মান্দা, পারজি, পেঙ্গু। কর্ণাটকের কোরাঙ্গা ও কুরুবা ভাষা; অন্ধ্রপ্রদেশের গাদাবা ও নাইকি ভাষা, তামিলনাড়ুর কোটা ও তোদা ভাষা; ঝাড়খণ্ডের বিরহোর, মহারাষ্ট্রের নিহালি, মেঘালয়ের রুঘা এবং পশ্চিমবঙ্গের তোতো ভাষা।

 

এই সমস্ত বিষয় থেকে প্রশ্ন জাগে যে তাহলে কি এই ভাষাগুলো বিলুপ্তির পথে? হিন্দি কি গ্রাস করছে মাতৃভাষা গুলোকে? কিন্তু আমরা দেখেছি ভাষা আন্দোলন,ভাষার জন্য লড়াই ২১শে ফেব্রুয়ারি হোক কিংবা আসামের শিলচরে ১৯শে মে র ভাষা আন্দোলন।বহু নারীরা এই আন্দোলনের সামিল হয়েছিলেন, পুলিশের গুলির সামনে নিজেদের আত্মাহুতি দিয়েছিলেন শুধুমাত্র মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে। আমাদের ইতিহাস আমাদেরকে শক্তি জোগায়।আমরা আশাবাদী আজও। মাতৃভাষা আমাদের প্রাণের ভাষা আমাদের আপন শক্তি–

বুকের রক্ত মুখে তুলে যারা মরে
ওপারে ঢাকায় এপারের শিলচরে
তারা ভালোবাসা-বাংলাভাষার জুড়ি—
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি

— অমিতাভ দাশগুপ্ত।

 

বাংলা ভাষা কি বিলুপ্তির পথে? লিখলেন কাকলি কর্মকার।


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।