গ্রিন টি: অমৃত ভেবে খাওয়া বিষ! কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

এখনই শেয়ার করুন

বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথে গ্রিন টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। আজকাল স্বাস্থ্যসচেতনতার মাপকাঠি যেন গ্রিন টি। কিন্তু এই গ্রিন টি আদৌ কতটা উপকারী, তা নিয়েই বিবিধ ডট ইন-এ গ্রিন টি: অমৃত ভেবে খাওয়া বিষ! লিখলেন ক্লিনিক্যাল ডায়েটিসিয়ান, ডায়াবেটিস এডুকেটর ও যোগ থেরাপিস্ট রাখি চট্টোপাধ্যায়।

কী এই গ্রিন টি?

প্রধানত ক্যামেলিয়া সাইনেসিস গাছের পাতা থেকেই গ্রিন টি আমরা পেয়ে থাকি। অন্যান্য চা এর মতো গ্রিন টি তৈরির জন্য কোনো অক্সিডেশন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় না। এর ব্যবহার সর্বপ্রথম চীন দেশে শুরু হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে তা এশিয়ার প্রত্যেকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

সবরকম আপডেট পেতে লাইক করুন বিবিধ-র ফেসবুক পেজ

 

গ্রিন টি-র গুণাগুণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে কোন প্রকার ক্যামেলিয়া গাছ থেকে তা সংগ্রহ করা হচ্ছে, কীরকম আবহাওয়াতে গাছগুলি বেড়ে উঠেছিল, এছাড়াও হর্টিকালচার পদ্ধতি, প্রোডাকশন পদ্ধতি ইত্যাদির ওপর। (গ্রিন টি: অমৃত ভেবে খাওয়া বিষ!)

আরও পড়ুন: জিভে প্রেম: আনলক রেসিপি— গোলকধাঁধা চিকেন

কেন খাবেন গ্রিন টি?

যেহেতু সাধারণ চায়ের মতো গ্রিন টি তৈরিতে অক্সিডেশন পদ্ধতি লাগে না। তাই তুলনামূলকভাবে গ্রিন টি-র উপকারিতা অনেক বেশি।

  • এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ও পলিফেনল, যা আমাদের শরীর থেকে ফ্রি রেডিক্যাল নিষ্কাশনে সাহায্য করে।
  • পলিফেনল এর মধ্যে প্রধানত epigallocatechin—3-gallate যৌগটি বর্তমান। এছাড়াও রয়েছে catechin, gallaogatechin, epicatechin, epicatechin gallate।
  • এতে উপস্থিত বিভিন্ন আলকালয়েড (যেমন ক্যাফিন, থিও ব্রোমাইন, থিও ফাইলিন ইত্যাদি) স্টিমুল্যান্ট এজেন্ট হিসাবে কাজ করে নার্ভের ভারসাম্য বজায় রাখে।
  • গ্রিন টি রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখে। LDL কোলেস্টেরল কমায় ও ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ করে।
  • যে সমস্ত ওষুধ রক্তপাত বন্ধ ও ক্ষত নিরামায়ের জন্য ব্যবহৃত হয়, তাতে গ্রিন টি ব্যাগ, পাতা ও এক্সট্রাক্ট ব্যবহৃত হয়।
  • গ্রিন টি-তে উপস্থিত উপকারী পলিফেনল যৌগ ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • উপযুক্ত সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রিন টি পান হার্ট ভাল রাখতে সাহায্য করে।
  • নিয়মিত ও পর্যাপ্ত গ্রিন টি পান করে বিভিন্ন নার্ভের সমস্যা ও স্ট্রোক থেকে দূরে থাকা যায়।
  • স্কিন ডিজিজের ক্ষেত্রেও গ্রিন টি উপকারী।
  • মস্তিষ্কের কগনিটিভ কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে গ্রিন টি উপকারী।
  • ক্রনিক alzheimer রোগের ক্ষেত্রেও গ্রিন টি-র সুনাম রয়েছে।
  • নিয়মিত গ্রিন টি সেবনে অর্থারাইটিস থেকেও উপশম পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: বাস্তুশাস্ত্র ও ফেং শ্যুই নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা আপনার মনে নেই তো?

গ্রিন টি মানেই গ্রিন সিগন্যাল নয়!

এবার প্রশ্ন হল, এত উপকার সত্ত্বেও গ্রিন টি-কে সবসময় গ্রিন সিগন্যাল দেব না কেন? বেশ কয়েকটা কারণ আছে। দেখে নিই সেগুলো কী কী:

১. ক্যাফিন সেনসিটিভিটি: যাঁদের ক্যাফিন সেনসিটিভিটি আছে, তাঁরা অধিক বা দীর্ঘ সময় ধরে গ্রিন টি খেলে অনিদ্রা, বমিভাব, মাথাব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যেতে পারে।

২. গ্রিন টি-তে ভিটামিন কে-এর পরিমাণ অনেকটাই বেশি। তাই যাঁরা ওয়ারফেরিন জাতীয় রক্ত তরল করার ওষুধ খাচ্ছেন, তাঁরা গ্রিন টি এড়িয়ে চলুন।

৩. যাঁরা বিভিন্ন প্রকার স্টিমুল্যান্ট ড্রাগ খান, তাঁরা যতদূর সম্ভব গ্রিন টি এড়িয়ে চলুন। কারণ এই ক্ষেত্রে গ্রিন টি হার্ট রেট ও ব্লাড প্রেসার বাড়িয়ে দেয়।

৪. গ্রিন টি-তে উপস্থিত catechin রক্তে ফলিক অ্যাসিডের শোষণ কিছুটা হলেও কমিয়ে দেয়। তাই প্রেগন্যান্সি আর ল্যাক্টেশনের ক্ষেত্রে গ্রিন টি কম খাওয়াই ভাল। প্রেগন্যান্সির প্রথম তিন মাস এড়িয়ে চলতে হবে। এর পর থেকে সারাদিনে 200 মিলি-র বেশি কোনওভাবেই খাওয়া যাবে না।

৫. পেপটিক আলসারের ক্ষেত্রে গ্রিন টি পানের দিক থেকে সচেতন হতে হবে। অধিক গ্রিন টি পান stomach-এ acid সিক্রিসনের পরিমান বাড়িয়ে দেয়।। অ্যাসিড রিফ্লাক্স ডিজিজের ক্ষেত্রে অধিক গ্রিন টি পানে ডায়রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়।

৬. ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে গ্রিন টি উপকারী হলেও অধিক সেবন কিন্তু বুমেরাং হতে পারে। গ্রিন টি-তে উপস্থিত পলিফেনল যৌগের ব্লাড সুগার কমানোর দারুণ প্রবণতা দেখা যায়। তাই বেশি গ্রিন টি পানে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়।

৭. গ্রিন টি-তে উপিস্থিত পলিফেনল যৌগগুলি আয়রনের সাথে যুক্ত হয়ে তাকে ইন্টেস্টাইনে শোষিত হতে বাধা দান করে। তাই যাঁদের রক্তাল্পতার সমস্যা আছে, তাঁরা গ্রিন টি এড়িয়ে চলুন। সাধারণ অবস্থাতেও বেশি গ্রিন টি কোনওভাবেই খাবেন না।

৮.অধিক মাত্রায় গ্রিন টি সেবন এক ধাক্কায় ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেশ বাড়িয়ে দেয়। তাই যাঁদের কিডনির সমস্যা আছে, তাঁরা এড়িয়েই চলুন গ্রিন টি। রেনাল ফেলিওর হওয়ার আশঙ্কাও রয়ে যায়।

আরও পড়ুন: বিল গেটস বাংলাদেশের এই ব্যক্তির দ্বারস্থ হয়েছিলেন কেন, জানেন?

কখন খাবেন গ্রিন টি?

অনেকেই সকালে উঠে খালি পেটে গ্রিন টি খান। যা একেবারেই কাম্য নয়। খালি পেটে গ্রিন টি খেলে পাকস্থলিতে acid সিক্রিসনের পরিমান বেড়ে যায়, যা ক্রমশ আলসারের রূপ নেয়। এছাড়াও ব্লাড প্রেসার কমে যাওয়া, বমিভাব, মাথা ঘোরা ইত্যাদিও দেখা যায়। তাই গ্রিন টি খাওয়ার উপযুক্ত সময় হল যে কোনও ভারি খাবার খাওয়ার দু’ঘণ্টা পর। (গ্রিন টি: অমৃত ভেবে খাওয়া বিষ!)

ঘুমোনোর আগে গ্রিন টি সেবন ইনসমনিয়ার কারণ। তাই কোনওভাবেই ঘুমোনোর আগে গ্রিন টি খাবেন না। অন্তত তিনঘণ্টা আগে খান।

গত কয়েক বছরে গ্রিন টি খাওয়াটা একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ না বুঝেই ফ্যাট কমানোর তাগিদে যত ইচ্ছে গ্রিন টি খেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে তাঁরা অনেকেই শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই উৎসাহে লাগাম না টানলে অমৃত ভেবে খাওয়া তরলই শেষমেশ গরল হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন: বসু বিজ্ঞান মন্দির থেকে নারীশিক্ষায় ভূমিকা, ‘জগদীশচন্দ্রের স্ত্রী’ই থেকে গেলেন অবলা

 

 

 

ক্লিনিক: ব্রেকফাস্টে কী খাবেন, কেন খাবেন?

রাখি চট্টোপাধ্যায়

ক্লিনিক্যাল ডায়েটিসিয়ান, ডায়াবেটিস এডুকেটর ও যোগ থেরাপিস্ট

Attached to Narayana Multi-speciality Hospital

Msc in Clinical Nutrition & Dietetics

Certified Diabetes Educator from National Diabetes Educator programme.


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।