‘আদর ছুড়বে পিয়ানো’, তমালের অনুষ্ঠান যেন সম্মোহনের মঞ্চ

শহরে ব্যস্ত রাস্তা। সপ্তাহ শেষের ক্লান্তি। ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। সঙ্গে একজন জাদুকরের শো। যিনি জাদুদন্ডে সম্মোহন করেন না। যাঁর বিরাট বড় রাজত্ব নেই, নেই কোনও সিংহাসন। অতি সাধারণ সহজ একজন মানুষ তিনি। যিনি যেকোনও মঞ্চে, তা সেখানে আড়ম্বর থাক আর না থাক। তিনি সম্মোহিত করে ফেলতে পারেন। শুধুমাত্র সুর, বাদ্যযন্ত্র, গলার স্বর আর কথা দিয়ে। তমাল কান্তি হালদার, এমনই একজন মানুষ যিনি একা হাতে এমন একটা অনুষ্ঠান করেন, যা দর্শকদের সম্মোহিত করেন। এভাবেই তিনি জাদু করেন।

৩০ জুলাই, শনিবার। দক্ষিণ কলকাতার নামজাদা ক্যাফে উইন্ড অফ চেঞ্জে তমালের অনুষ্ঠান ছিল, ‘আদর ছুড়বে পিয়ানো।’ নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছিল, এমন অনুষ্ঠান এর আগে শিল্পী করেননি। আবার শিল্পী এমনটাই জানাচ্ছিলেন সামাজিক মাধ্যমে যে, এমন অনুষ্ঠান ভবিষ্যতে আর করবেনও না। তাহলে স্বাধীন বাংলা গানের অন্যতম সৈনিক তমাল, ইতিহাস তৈরী করবেন? এমনটাই প্রত্যাশা নিয়ে আমি হাজির হলাম ক্যাফেতে। সত্যিই তাই, এমন অনুষ্ঠান শিল্পী এর আগে করেননি। যাঁরা তমালের শ্রোতা, দর্শক বা হয়তো চেনেনই না তাঁকে। যাঁরা সেদিন তমালকে দেখেননি, তাঁরা বুঝবেন না তাঁরা কী মিস করলেন। এবং যাঁরা দেখলেন, তাঁরা বুঝবেন কী এমন অদ্ভুত অনুভূতির স্রোতের সাক্ষী থাকলেন।

এদিন, তমালের অনুষ্ঠানে ছিল গান, ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক এবং সমাজ দর্শনের কথা। শিল্পী, তিনি যতই গুণী, পারদর্শী হন না কেন! তিনি যদি মানুষ হিসেবে সংবেদনশীল না হন, মানবতার ধারক বাহক না হন, সমাজের শিকল ভেঙে, দেশ-ধর্মের বিভেদ পেরিয়ে না আসতে পারেন। তিনি কীসের শিল্পী? তমালের অনুষ্ঠানে তাই বিনোদন কম পড়ে যায়। বিষন্নতার শহরে, হাইরাজ বিল্ডিংয়ের সামনে বসে, পাঁচতলা মলের চাকচিক্য ভুলিয়ে দিয়ে কঠিন, অস্বস্তিকর সমাজের ছবিটা এঁকে ফেলতে পারেন। তিনি অধার্মিক হতে পারেন। জ্ঞানের আলো দেখাতে পারেন। ঋজু, নির্ভীক মনের জন্ম দিতে পারেন। যখন তমাল গান গাইছেন তখন, সেই শহরে টাকার পাহাড়ের ছবি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই টাকা ছুঁতে কেউ পারছেন না। কারণ, সেই টাকার আড়ালে কত কোটি কোটি মানুষের চোখের জল, বঞ্চনা, শ্রম রয়েছে যে। তমাল বলছেন তাঁদের কথা। মাঝেমাঝে আড়ালে, আবডালে কে চোর? কারা চোর সেদিকে ইঙ্গিতও করছেন। তমাল বলছেন, ‘চুরি যে হচ্ছে সেটা কি জানতাম না আমরা? অবাক হচ্ছি যেন নতুন করে? আমরা খেতে পাচ্ছি না মানেই তো কেউ না কেউ চুরি করছে?’ এতো সহজ, সরলভাবে আর্থসামাজিক কাঠামোকে কোনও তাত্ত্বিক, সমাজবিজ্ঞানীরাও আক্রমন করতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ? ঠিক যেভাবে তমালের গানে রয়েছে, গীতা কোরান কি কোনওভাবে খিদেতে পেটের জ্বালা মেটাতে পারে? তমালের গানে রয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে একজন শিশুর আর্তনাদ। যাঁরা শিল্পীর গান শোনেন, অনুধাবন করেন, তাঁরা তমালের জীবনদর্শনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারেন। শিল্পীও তাঁদের বন্ধুর গান গেয়ে, গলায় জড়িয়ে ধরতে পারেন। মিশে যেতে পারেন সাধারণ থেকে অতিসাধারণের ভিড়ে।

তমালের সেটলিস্টে সেদিন গান যেমন ছিল তেমন ছিল ইন্সট্রুমেন্টাল সঙ্গীত। শহর কলকাতায় শুধু ইন্সট্রুমেন্টাল অনুষ্ঠান হয় কোথায়? তমালের জাদুঘরে প্রবেশ করলে এমনটা কখনও শুনতেও পারেন। স্রেফ কিবোর্ডের ওপর ঝড়ের বেগে হাত চলছে শিল্পীর। ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দ ঠোঁট আর অপলক দৃষ্টি হা করে গিলতে বাধ্য করছে তমালের বাজনা। ক্ষনিকের জন্য যখন চারপাশে চোখ পড়ছে, দেখছি ক্যাফেতে বসে থাকা দর্শক মুগ্ধ দৃষ্টিতে তমালের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কখনও মৃদু, হালকা আদরে পিয়ানোয় হাত ছোঁয়াচ্ছেন শিল্পী। কখনও, উথাল পাথাল করে তুলছেন মনকে পিয়ানোর আওয়াজে। সাতটি মতো ইন্সট্রুমেন্টাল পারফর্ম করলেন তিনি। এক একটি গানের এক একটি ছবি। তার আলাদা গল্প। বিভিন্নরকম কান্নার সুর। এই সমস্তকিছু একসঙ্গে বয়ে যাচ্ছে, অজানা এক পাহাড়ের খাদে। সেই সুরের গল্পগুলো আমার কাছে কখনও ক্ষুধার্ত মানুষের কান্না, কখনও প্রতারিত মানুষের আর্তনাদ, আবার শোষিত মানুষের মিছিলের স্লোগান, কখনও বা পুরুষতন্ত্রের শিকল ভেঙে বেরোতে চাওয়া একটা মেয়ের চিৎকার। তমালের বাজনা, নিশ্চুপতায় গ্রাস করছে সকলকে। ক্যাফের কফিমেশিনের আওয়াজ তখন অযথা যুদ্ধ করছে তমালের সঙ্গে। অসহায়, আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে কফিমেশিন তমালের পারফরম্যান্সের কাছে।
তমাল এক একটা গান গাইছেন, স্মৃতির স্মরণী নিয়ে মনখারাপ করা বিকেলে নিয়ে যাচ্ছেন। কখনও আমার চূড়ান্ত অপমানের দিনগুলো ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কখনও জেদ, শক্তির পুনর্জন্মও ঘটাচ্ছেন। তাঁর তৈরি মৌলিক বাংলা গানগুলোর প্রত্যেকটি আলাদা, স্বতন্ত্র। অত্যন্ত নিবিড়, সংবেদনশীল। যে গানগুলো কখনও সমাজ, কখনও আমাদের প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত অপত‍্য প্রেম, বা হয়তো প্রেমিক প্রেমিকার কথা মনে করিয়ে দেয়। তমাল সেই সমস্ত গান যখন গান, তখন দর্শকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে একটা বন্ধন তৈরি করেন। লাইভ অনুষ্ঠানে সবসময় আর গলা মেলাতে ইচ্ছে লড়ে না। শুধু মনে হয়, তমাল গাইছেন যেন সবার গলা হয়ে গাইছেন। শিল্পী যখন অনলাইনে অনুষ্ঠান করেন তখনই হোক কিংবা কোনও মঞ্চে এসে দর্শকদের সামনে বসেন। অনুভূতির পার্থক্য করা যায় না।

তমালের একটি গান আছে, ‘আলাদিন’। আলাদিন এমন একটা চরিত্র যে স্বপ্ন তৈরি করে। উড়ে যায় এমন এক পৃথিবীতে যেখানে ধর্ম, জাতি নেই। ঈশ্বর নেই। তাই ঈশ্বরসেবা করতে গিয়ে কারোর মৃত্যুও হয় না। ঈশ্বরপুজোর নামে কেউ খুনও হন না। তমাল এবং তাঁর অনুষ্ঠানও সেই আলাদিনের তৈরি পৃথিবীর মতো। যেখানে গেলে স্বপ্ন তৈরি হয়, শিল্পীর ম্যাজিকে। তবে তমালের এই শেষ একক অনুষ্ঠান যার পোশাকি নাম ছিল কিনা ‘আদর ছুড়বে পিয়ানো’। এমন অনুষ্ঠান কি সত্যি তমাল আর করবেন না? এই অনুষ্ঠানে যেভাবে শিল্পী ইন্সট্রুমেন্টাল পারফর্ম করলেন, সেটা কি আর এ শহরে হবে না? শিল্পী এমনটাই বলেছেন আপাতত। যে, আর তিনি এমন অনুষ্ঠান করবেন না। কিন্তু তমালের শ্রোতারা কি সেটা হতে দেবেন? দর্শকদের দাবিতে ফিরতে হবে না তো আবার?

কারণ তমালই তো বলেছেন, ‘তোকে নতুন করে পাব বলে, বাজে গান লিখি সময় দিই জলে।’ নতুন করে শিল্পীকে আবার পাওয়ার আশা তো এভাবেই তাঁর শ্রোতারা বাঁচিয়ে রাখবেন, আগলে রাখববেন শিল্পীকে। তমালকে মঞ্চে ফেরানোর দায়িত্ব থাকবে তাঁদের ওপরেই। কারণ, এখনও যে রূপকথার ম্যাজিক বাকি। স্বপ্নের ডানায় ভর করে তমালের সঙ্গে জার্নি করা বাকি, স্বাধীন বাংলা গানের মুক্ত আকাশে।

লিখেছেন অরিঘ্ন মিত্র

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: