কথাসাহত্যিক শরৎচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত হাওড়ার দেউলটি

 

বিবিধ ডট ইন: কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হাওড়ার দেউলটিতে কাটিয়েছেন সুদীর্ঘ বারো বছর। তারপর কলকাতায় ফেরার তিনবছর বাদে তাঁর মৃত্যু হয়।
কলকাতা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দেউলটি এখন পর্যটকদের আকর্ষণের বিষয়বস্তু। দ্বিতীয় হুগলি সেতু দিয়ে নেমে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ৬নং জাতীয় সড়ক ধরে এগোলেই পড়বে বাগনান। বাগনান ছাড়িয়ে খানিকটা গেলেই পাওয়া যাবে দেউলটি ক্রসিং। রেলযোগে যেতে গেলে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে দেউলটি স্টেশনে নেমে রিক্সা বা ভ্যান নিয়ে সহজেই পৌঁছানো যাবে শরৎচন্দ্রের বাড়ি।
স্থানীয় লোকেদের কাছে যেটি শরৎ কুঠি, সেটি আসলে রয়েছে ছোট্ট একটি গ্রাম সামতাতে। গ্রামটি দেউলটি সংলগ্ন। পরে শরৎচন্দ্র এটির নাম দেন সামতাবেড়। ১৯১৯ সালে এখানে জমি কেনেন শরৎচন্দ্র।
হুগলী জেলার দেবানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করলেও শরৎচন্দ্রের প্রথম জীবন কাটে তাঁর মামার বাড়ি বিহারের ভাগলপুরে। সেখানে কিছুটা বড় হবার পর তিনি চাকরির খোঁজে ব্রহ্মদেশে যান এবং সেখানে ১১ বছর কাটান। সেখান থেকে দেশে ফিরে তিনি হাওড়া জেলার বাজে শিবপুরে কিছুকাল থাকেন। সামতার এই বাড়িটি তৈরি হয় ১৯২৩ সালে ১৭০০০ টাকায়। এরপর সেখানে তিনি থাকতে আরম্ভ করেন। এখানে থাকাকালীন তিনি লেখেন ‘দেবদাস’, ‘বৈকুন্ঠের উইল’, ‘দেনা পাওনা’, ‘দত্তা’, ‘নিষ্কৃতি’র মত বহু কালজয়ী উপন্যাস এবং মহেশ রামের সুমতির মত ছোট গল্প।
ব্রহ্মদেশে বহুদিন থাকার ফলে সামতার এই বাড়িটির ভাস্কর্য ব্রহ্মদেশ অনুপ্রাণিত। বর্তমানে এই দ্বিতল বাড়িটি শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে একটি সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে। সঙ্গে একটি ছোট গ্রন্থাগারও রয়েছে। ১৯৭৮ সালের বন্যায় বাড়িটির প্রভূত ক্ষতি হয়। ২০০৯ সালে বাড়িটির সংস্কার করা হয় এবং তার পূর্বরূপ তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই বাড়িটিকে বর্তমানে ‘হেরিটেজ বিল্ডিং’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
যদিও প্রথম যখন শরৎচন্দ্র এই গ্রামে আসেন তখন এই গ্রামের মানুষ তাঁকে সহজভাবে নিতে পারেনি। জাতপাত নিয়ে তাঁর লেখা, মেয়েদেরকে সমাজে বড় করে দেখানো মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। পরে অবশ্য তাঁর খ্যাতি যত বেড়েছে, তত গ্রামটি তাঁকে আপন করে নিয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত হোমিওপ্যাথির দাতব্য চিকিৎসালয়টি আজও রয়েছে।
রূপনারায়ণ নদ বয়ে গেছে শরৎচন্দ্রের বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষে। বার্মা কাঠ দিয়ে তৈরি শরৎচন্দ্রের লেখার টেবিল, জাপানি ঘড়ি, তাঁর ব্যবহৃত হুঁকো, বইয়ের তাক এখনও অমলিন। সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি সাধারণ দর্শকদের জন্য বাড়ির দরজা খুলে দেওয়া হয়। এখানে যিনি রক্ষণাবেক্ষণ করেন, তিনিই পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখান। শীতকাল এখানে যাওয়ার পক্ষে উপযুক্ত সময়। শরৎচন্দ্র, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবী, তাঁর ভাই স্বামী বেদানন্দ, যিনি বেলুড় মঠের দীক্ষিত ছিলেন—তাঁদের তিনজনের সমাধি এই বাড়ির বাগানে রয়েছে। আর আছে কথাশিল্পীর নিজের হাতে লাগানো বাঁশ ও পেয়ারা গাছ। এখানে এলে ইতিহাস ফিসফিস কথা বলবে। শরৎসাহিত্যের চরিত্ররা যেন ঘুরে বেড়ায় এই বাড়ি, রূপনারায়ণের চর জুড়ে।

লিখেছেন অদিতি দাশগুপ্ত

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: