গোটা শতাব্দীতে বিরল! জীবনানন্দের ঘাতক ট্রাম কি আসলেই দুর্ঘটনা? নাকি আত্মহত্যা?

 

‘যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছিল, ট্রামলাইনের সেই জায়গা জুড়ে সবুজ ঘাস— আশ্চর্য, শানবাঁধা কলকাতায় জীবনানন্দের জীবনের চরম দুর্ঘটনা এমন জায়গাতেই ঘটল যেখানে ঘাস, ঘাস— যে ঘাসের প্রতি তাঁর ভালবাসা প্রগাঢ়, প্রবল।’
জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু নিয়ে আছে নানা দোলাচল, এটা মৃত্যু নাকি আত্মহত্যা। সেই মর্মান্তিক দিনটি হল, ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪; বাংলায় ৫ কার্তিক। কিন্তু তার মৃত্যুটা তার লেখনীর মতো মিলে গেল কী করে ? জীবনানন্দ দাশের ফুটপাথ’ কবিতাটা মনে পড়ে? ‘ট্রামের লাইনের পথ ধরে হাঁটি: এখন গভীর রাত/ কবেকার কোন্ সে জীবন যেন টিটকারি দিয়ে যায়/ ‘তুমি যেন রড ভাঙা ট্রাম এক— ডিপো নাই, মজুরির প্রয়োজন নাই/ কখন এমন হয়ে হায়!/ আকাশে নক্ষত্রে পিছে অন্ধকারে/ কবেকার কোন্ সে জীবন ডুবে যায়’। তার এই মমার্ন্তিক ঘটনা কবিতা মহল থেকে শুরু করে সাহিত্যিক মহলে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। অনেকেই ভাবেন তার মৃত্যুটা কোনো দুর্ঘটনা নয় ! আত্মহত্যা, তবে এরকম নৃশংসতা রূপ আত্মহত্যার পথ কেনো বেছে নিলেন। তবে কি তিনি তার ‘ফুটপাথ’ কবিতার মধ্য দিয়ে আগাম জানান দিয়েছেন।
এমনিতেও মানুষটার শেষ জীবন বড়োই কষ্টে কেটেছে। তার নিথর রক্তাক্ত দেহটা লুটিয়ে আছে, ঠিক যেন তার লেখা জীবনানন্দের ‘গ্রাম ও শহরের গল্প’-তে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে রাতের কলকাতায় বিছোনো ট্রামলাইনকে দেখে শশীর মনে হয়েছিল ‘বিরাট হাঙর’। কথিত আছে, ঘটনাটি ঘটেছিল ১৪ অক্টোবর সকালে রাসবিহারী এভিনিউর কাছে রাস্তা পেরনোর সময় ডাউন বালিগঞ্জ ট্রাম এসে ধাক্কা দিল। অবিরাম ঘণ্টা বাজিয়ে তাঁকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন চালক, চেঁচিয়ে সাবধান করারও চেষ্টা করেছিলেন। অথচ জীবনানন্দ কিছুই শুনতে পাননি। অতলান্তিক এক ঘোর তাঁকে ঘিরে ছিল। ব্রেক কষেও দুর্ঘটনা এড়াতে পারেননি ট্রাম-চালক। কে যে কাকে ধাক্কা দিয়েছিল সেদিন! এই যদি ঘটনা হয়ে থাকে তাহলে তিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য। হাসপাতালে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকা মানুষটা তাঁর হাত ধরেই একটা কমলালেবু খেতে চেয়েছিলেন। আটদিন অপেক্ষার পর অবশেষে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যু। তার মৃত্যুর পর তার শবদেহ যখন নিয়ে আসা হয়, তখন তার বাড়িতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সাহিত্যিকের ভীড় উপচে পড়ছিল। তার এরকম অস্বাভাবিক মৃত্যু কবিতামহল থেকে শুরু করে পাঠকমহল কেউ মেনে নিতে পারেননি। তার মৃত্যুর পাশাপাশি তার সেই ঘাতক অভিশপ্ত ট্রামটাও পুড়ে শেষ হয়ে গেছিল। কিন্তু তিনি যে কবি তার মৃত্যু হয় না, তার লেখনীতে তিনি অমরত্ব লাভ করেছে।

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: