মায়ের খোঁজে সটান নিষিদ্ধপল্লিতে ‘বেআক্কেলে’ বিভূতিভূষণ

 

বিবিধ ডট ইন: জন্মসূত্রে বিভূতিভূষণ ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ‘শাস্ত্রী’ উপাধিপ্রাপ্ত সংস্কৃত পণ্ডিত, যদিও তাঁরা ছিলেন হতদরিদ্র। বিভূতিভূষণের বয়স তখন চার কিম্বা পাঁচ, পিতা মহানন্দের সাথে কলকাতা এলেন তিনি। শহরের তথাকথিত ‘ভদ্র’ পাড়ায় ঘর ভাড়া নেবার সামর্থ্য না থাকায় মহানন্দ একপ্রকার বাধ্য হয়েই শহরেরই এক ‘নিষিদ্ধ পল্লী’র বস্তিতে বসবাস শুরু করলেন বিভূতিভূষণ এবং মহানন্দ।

পিতামাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বিভূতিভূষণ বয়োজ্যেষ্ঠ, সেই সময় শহরের ‘নিষিদ্ধ পল্লী’তে মায়ের স্নেহ ছাড়াই বেড়ে উঠতে থাকা বিভূতিভূষণের সঙ্গে তাঁর পাশের বাড়ির এক মহিলা অনেকটা মায়ের অভাব কিছুটা পুরন করেছিলেন। তিনি প্রায়শই গল্প করে, সন্তান স্নেহে আদর করে কখনও লজেন্স কিনে দিয়ে ক্রমেই বিভূতিভূষণের ‘মা’ হয়ে উঠেছিলেন ‘নিষিদ্ধ পল্লী’র ঐ মহিলা।

আসল গল্পটা এর অনেকদিন পর, মধ্যবয়স্ক বিভূতিভূষণ তখন কলকাতারই একটি মেসে থাকেন। একদিন হঠাৎ করেই তাঁর মনে পড়ে গেল সেই ‘নিষিদ্ধ পল্লী’র মায়ের কথা। খুব দেখতে ইচ্ছে হল সেই ‘মা’ কে, তাই যেমনি ভাবনা তেমনি কাজ। মধ্যবয়সী বিভূতিভূষণ সটান হাজির হলেন সেই ‘নিষিদ্ধ’ পাড়ায়। এদিকে বাধলো আরেক কান্ড, সে পাড়ায় হাজির হতেই মধ্যবয়সী বিভূতিভূষণ-কে ‘বাবু’ ভেবে তাঁর উপর একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়লেন চার-পাঁচ মহিলা, প্রত্যেকেরই আবদার বিভূতিকে তাঁদের ঘরে যেতে হবে।

এদিকে বিভূতি তাঁদের বোঝাতে চাইলেন অন্য কোনও উদ্দেশ্য নয়, তিনি তাঁর ছেলে বেলার ‘মা’ কে খুঁজতে এসেছেন এ পাড়ায়, কিন্তু সেই মহিলারা তাঁর দাবী মানতে নারাজ। শেষমেশ কোনও প্রকারে দৌড়ে পালিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিলেন তিনি।

কোনওমতে মেসে ফিরে প্রাণের বন্ধু নীরদচন্দ্রকে তিনি বলেন এই গল্প। একদফা হাসি ঠাট্টার পর বিভূতিভূষণ-কে ‘বে-আক্কেলে’ বলেন তিনি। অবশ্য বিভূতিভূষণ যে চিরকালই বেয়াক্কেলে ছিলেন, তার প্রমান মেলে আরও একটি ঘটনায়, তাঁকে একবার তাঁরই এক বন্ধু বলেছিলেন ওয়ে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে নাকি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বেশ্যারা দাঁড়িয়ে থাকে রাতের বেলায়।

সেই বন্ধুই বিভূতিভূষণ-কে জানালেন, তিনিও যাবেন, সঙ্গে যাবেন বিভূতিভূষণ। তখন তিনি চল্লিশের কোঠায়। শীতের রাত, নভেম্বর মাস, যথারীতি ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বেশ্যা’দের দেখা পেতে রাত এগারোটা নাগাদ ওয়েলিংটন স্কোয়ারে হাজির বিভূতিভূষণ। কিন্ত একি! বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি দেখা পেলেন না এই জায়গার খোঁজ দেওয়া সেই বন্ধুটির, অন্যদিকে যাদের সন্ধানে এখানে আসা, তারাও বেপাত্তা! শেষমেশ আবারও কিছুটা রাগে কিছুটা অভিমানে বিভূতিভূষণ অগত্যা ফিরে এলেন মেসে।

আসলে অন্য কোনও উদ্দেশ্য নয় স্রেফ গল্প লেখার রসদ খুঁজতেই এমন নানান কান্ড বাধাতেন প্রায়ই বিভূতিভূষণ। তাঁর প্রাণসখা নীরদচন্দ্রের কথায়,

‘আসলে লেখার রসদ খোঁজার জন্যই জীবনকে নতুন ভাবে উপলব্ধি করতে এরকম নানান কান্ডকারখানা করতো বিভূতি। জীবনটাকে এভাবেই দেখতে চাইতো ও। তারই মধ্যে মাঝেমঝে এমন নানান ‘বে-আক্কেলে’ কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলতেন তিনি’

লিখেছেন সায়ন্তন মন্ডল

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: