রিভিউ: ভক্তের চোখে ফকিরার ডিজিটাল কনসার্ট: প্রিয়ম সেনগুপ্ত

এখনই শেয়ার করুন

ভক্তের চোখে ফকিরার ডিজিটাল কনসার্ট

লকডাউনে ঘরবন্দি গোটা বিশ্ব। তবুও থেমে নেই পরস্পর পরস্পরের যোগাযোগ। এ এক সাঙ্গীতিক যোগ। খোদ কলকাতায় ডিজিটাল কনসার্ট-এর ওপর ভর করেই চলছে সেই সংযোগসাধন। সম্প্রতি ডিজিটাল কনসার্টে দেখা গেছে বাংলা ব্যান্ড ফকিরা-কে। সেই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই ভক্তের চোখে ফকিরার ডিজিটাল কনসার্ট লিখলেন প্রিয়ম সেনগুপ্ত

 

‌‌প্রযুক্তি আশীর্বাদ না অভিশাপ, এ নিয়ে বিতর্ক ছিল, আছে, থাকবেও। অন্য নানাক্ষেত্রের মতোই বিনোদনের ক্ষেত্রও এই বিতর্কের ছায়াকে ঝেড়ে ফেলতে পারেনি। কারণ একটাই, পাইরেসি!‌ তাই প্রযুক্তির সোজা এবং বাঁকা পথে নানা ব্যবহার নিয়ে রুষ্ট হতে দেখা যায় খাস কলকাতার নানা শিল্পী ও ব্যান্ডকেই।
তবে আশার কথা একটাই। লকডাউনের আবহে প্রযুক্তিই যে টিঁকে থাকার একমাত্র পথ, সেটা বুঝে নিতে দেরি করেননি শিল্পীরা। একের পর এক লকডাউন কনসার্ট হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। যার মধ্যে সাম্প্রতিকতমটি হল ফকিরার ডিজিটাল কনসার্ট।

বাংলা ব্যান্ডের অনুসারী যাঁরা, তাঁদের কাছে ফকিরার নাম নতুন করে বলার কিছু নেই। বাংলা লোকগানের যে আবহমান ধারা, তাকেই যুগোপযোগী করে উপস্থাপন করে ফকিরা। একসময়ে ফসিল্‌সের হাত ধরে বাংলা রকের যে উত্থান হয়েছিল, সেটা যেমন অগণিত বাংলা ব্যান্ডকে রকের ধারায় টেনে এনেছিল, তেমনই বর্তমানে ফোক–ফিউশনে ফকিরা। বাংলা রক ব্যান্ড করেছেন, ব্যান্ড করেন, অথচ ফসিল্‌সের দ্বারা অনুপ্রাণিত নন, এমন শিল্পী যেমন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, তেমনই এই মুহূর্তে ফোক–ফিউশন করছেন, অথচ ফকিরার গানের জন্য মুখিয়ে থাকেন না, এমন ব্যান্ডও নেই বললেই চলে। কেন ফকিরার এই তুমুল জনপ্রিয়তা, সেটা বোঝা যাবে তাদের প্রথম ডিজিটাল কনসার্টের নিয়ে উন্মাদনা দেখেই।
কনসার্ট শুরু হতেই চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। আহা!‌ কী চমৎকার মঞ্চসজ্জা (‌হোক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, আমি মঞ্চই বলব)‌, কী চমৎকার ‘‌স্মার্ট প্রেজেন্টেশন’‌!‌ যে ফকিরাকে আমরা দেখতে অভ্যস্ত কালো পোশাকে, তারা কিনা দুধসাদা ধুতি–পাঞ্জাবিতে সাজিয়েছে নিজেদের। এ সাদা বেনীআসহকলা–র চেয়ে ঢের বেশি ঝলমলে। অনেকের মতো আমিও বলব, বাস্তবের কনসার্টের স্বাদ কিংবা উন্মাদনার সঙ্গে ডিজিটাল কনসার্টের তুলনা হয় না। কিন্তু প্রিয় শিল্পীদের হাতের নাগালে যখন পাচ্ছি না এবং সেই না পাওয়া নিয়ে যখন একটা তিরতিরে মনখারাপ রয়েইছে, তখন শিল্পীদের দিক থেকেও এমন একটা কিছু করে ডিজিটাল ঝটকা (‌পড়ুন চমক)‌ দিতে হয়, যাতে আমাদের মন থেকে ওই না পাওয়াটুকু মুছে যায়।
পোশাক এবং মঞ্চসজ্জা সেই কাজটাই করে গেল অনায়াসে।
ফকিরা হল সেই বিরল প্রজাতির ব্যান্ড, যাদের প্লাগ্‌ড কনসার্টের পাশাপাশি আনপ্লাগড পারফরমেন্স দেখার জন্যও আমি ব্যক্তিগতভাবে মুখিয়ে থাকি। কারণ ওদের অ্যারেঞ্জমেন্ট এতটাই ঝরঝরে ও সুখশ্রাব্য যে, একই গান প্লাগড এবং আনপ্লাগড দুইরকম ভার্সনেই সমান উপভোগ্য। যাঁরা ফকিরার ভক্ত হয়েও ওদের আনপ্লাগড দেখেননি (‌বিশেষত ‘‌অপার হয়ে বসে আছি’‌ লাইভে শোনেননি)‌ তাঁদের বরাত নেহাতই মন্দ। দেখে ভাল লাগল, প্রথম ডিজিটাল কনসার্টে ফকিরাকে দু’ভাবেই পাওয়া গেল। ভোকালিস্ট তিমির বিশ্বাস অবশ্য এই সেট–আপ সম্পর্কে বারবার বললেন ‘‌ইলেক্ট্রো–অ্যাকুস্টিক’‌ শব্দটা। তবে ব্যক্তিগতভাবে একজন আমবাঙালি শ্রোতা হিসেবে যদি এই অ্যাকুস্টিক ও ইলেকট্রিক ইনস্ট্রুমেন্ট মিশিয়ে পারফর্ম করার ধরনটাকে আমি ‘‌ফকিরাচিত’‌ ধরনের কোনও নাম দিই, কেউ আপত্তি করবেন নাকি?‌ মনে হয় না।

আরও পড়ুন: রিভিউ: ভক্তের চোখে ‘রূপম ইসলাম একক’: অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়

শো গড়াল যত, ফকিরাও জমাট হয়ে উঠল ততই। যতই তিমির–চয়ন–কুণালরা বারবার ক্যামেরার সামনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে ফেলুন না কেন, তাঁদের টেনশন হচ্ছে প্রথম ডিজিটাল কনসার্ট নিয়ে, তাঁরা বোধহয় ভুলে গেছিলেন, ফকিরা এমন একটি ব্যান্ড, যাদের কোনও ‘‌হেটার’‌ নেই। অতএব খারাপ লাগারও প্রশ্ন নেই। বিশেষত ‘‌আনন্দবাজার’‌ শুরু হতেই বোঝা গেল, দ্বিতীয় অ্যালবামের প্রোডাকশন কোন উচ্চতায় যেতে চলেছে। ‘‌আনন্দবাজার’‌ আমার খুব প্রিয় গানগুলোর একটা নয়। তবু, এক মুহূর্তের জন্য কান ফিরিয়ে রাখা যায় না। কী প্রচণ্ড টাইট, মেদবর্জিত উপস্থাপনা। শুধু আনন্দবাজার কেন, আলাদা করে ‘‌শ্যাম অঙ্গে’‌ গানটির কথা না বললেও তো অন্যায়ই হবে। একটা ব্যান্ডের কো–অর্ডিনেশন এবং সাঙ্গীতিক প্রজ্ঞা কোন পর্যায়ে গেলে এই ধরনের প্রোডাকশন হতে পারে, সেটা সহজে কল্পনাও করা যায় না, বাজানো তো পরের কথা। গানটা কানে লেগে রইল। প্রথম অ্যালবাম থেকে ‘‌ইতরপনা’‌–য় যে নতুন গিটার লাইন যুক্ত করেছেন ব্যান্ডের রিদ্‌ম গিটারিস্ট অপূর্ব দাস, সেটা সত্যিই অপূর্ব। রিদ্‌ম গিটারিস্টরা সাধারণত অন্তরালেই থেকে যান। কিন্তু যে এক্সট্রা লোড এবং এফোর্ট দিয়ে অপূর্ব বাজাচ্ছেন, তাতে চয়ন আর অপূর্বর জুটি ক্রমেই ধ্রুপদী সঙ্গীতের মঞ্চের দুই ওস্তাদের যুগলবন্দীর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ফকিরার লাস্ট যে শো দেখেছিলাম (‌বারাসত কিংস্টন কলেজ)‌ তার তুলনায় ফকিরার প্রতিটি সদস্যের বাজানোয় একাধিক পরিবর্তন এসেছে। আর সেই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট বেসিস্ট কুণাল বিশ্বাসের বাজানোতে। ভদ্রলোকের গিটারটা রংচটা হতে পারে, কিন্তু এমন সমস্ত বেস লাইন বাজাচ্ছেন, চারপাশটা যেন রঙে ঝলমল করে উঠছে।

রিভিউ: ভক্তের চোখে ফকিরার ডিজিটাল কনসার্ট: প্রিয়ম সেনগুপ্ত
শো চলাকালীনই তিমির বিশ্বাস তুললেন এক দর্শকের অনুযোগের কথা। তিনি নাকি তিমিরের কণ্ঠে লালনের ভাব পাচ্ছেন না। যতদূর জানি রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো লালনগীতির কোনও প্রামাণ্য স্বরলিপি নেই। কোন গান কোন ভাবে গাইতে হবে, সে ব্যাপারেও কোনও স্পষ্ট নির্দেশিকা নেই। তবে যে কোনও সঙ্গীতপ্রেমী মাত্রেই একমত হবেন, লালন ছিলেন এক সহজভাবের মানুষ। ঈশ্বরচিন্তা তাঁর কাছে যেমনভাবে এসে ধরা দিয়েছে, ঈশ্বরকেও তিনি সেইভাবেই অনুভব করেছেন। যে মানুষটি ঈশ্বর এবং ধর্মের মতো দুই অতি কঠিন বিষয়কে কোনও বাঁধাধরা গতে, কোনও নির্দিষ্ট তারে বেঁধে রাখেননি, তিনি নিজের গানগুলোর ক্ষেত্রে কি কোনও সুনির্দিষ্ট ভাব (‌যেটাকে লালনীয় ভাব‌ বলা হচ্ছে)‌ তৈরি করে গেছেন?‌
কী জানি, খটকাটা কিন্তু থেকেই গেল।
বরং এরকম ভেবে নিলে কেমন হয়, লালন একজন সহজ মানুষ। তাঁর গান যাঁর কাছে যেভাবে ধরা দিচ্ছে, তিনি না হয় সেভাবেই গাইলেন।
দেখে ভাল লাগছে, চয়ন নিয়মিত ফকিরার মঞ্চ থেকে গাইছেন। তাঁর কণ্ঠে একটা বিরল মাধুর্য রয়েছে। সেটা বারেবারে সামনে আসাটাই বাঞ্ছনীয়। এই কনসার্টেও তার ব্যতিক্রম হল না। ফুটবলে একটা কথা আছে, সেটা হল কোন প্লেয়ার কত ভাল, সেটা বোঝা যায় তার অফ দ্য বল মুভমেন্ট দেখে। চয়ন যখন গাইছেন, বান্টি যেভাবে ‘‌ক্ল্যাপ’‌ বাজাচ্ছিলেন সেটা সম্ভবত পূর্বপরিকল্পিত নয়। অন্তত তিমিরের শরীরী ভাষা তা-ই বলছি। ওই ‘‌ক্ল্যাপিং’‌ শুনে মনে হল, আহা, এটাই তো দরকার ছিল এখন।

আরও পড়ুন: রিভিউ: ‘উই শুড নট ট্রাই টু বি হোয়াট উই আর নট’, ভক্তের চোখে অঞ্জন: ঈশান পাল

কথায় কথায় অবশ্য উঠে এল আরও একটি প্রসঙ্গ। ফকিরা নিজস্ব গান (‌ওন কম্পোজিশন)‌ কবে গাইবে?‌ ফকিরার কাজ প্রোডিউস করা নয়। বরং বাংলা লোকগানের যে অনন্ত সুখশ্রাব্য ভাণ্ডার, যে সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য রয়েছে, তার ব্যাটন পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া। বহু ব্যান্ড যেমন ফসিল্‌সকে শুনে রক করতে শুরু করেছে, তেমনই অলিতেগলিতে অনেক ব্যান্ড হয়েছে, যারা ফকিরাকে শুনেই ফোকচর্চায় নেমেছে। এই অনুপ্রেরণাটা দেওয়া, এই চর্চাটা চালিয়ে যাওয়াটাই ফকিরার কাজ। দুই প্রজন্মের মধ্যে তারা বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করছে। যেমন রেলের ইঞ্জিনের কাজ নিজে গন্তব্যে পৌঁছনো আর মাঝের বগিগুলোর কাজ ইঞ্জিনের দেখানো পথে তার মধ্যে থাকা যাত্রীদের স্টেশনে পৌঁছে দেওয়া, এক্ষেত্রেও ফকিরার ভূমিকাটাও সেরকমই। এ প্রসঙ্গে অবশ্য তিমির ইতিমধ্যেই বলে রেখেছেন, ‘‌লোকগীতি মানুষের কথা বলে, জীবনের কথা বলে, সৃষ্টির কথা বলে, এই আদি অনন্ত জীবনের একদম শিকড়ের কথা বলে। মানুষের সত্যি মানুষ হয়ে ওঠার কথা বলে। জীবন সাধনার কথা বলে! সেই দর্শন এতোই গভীর যে আমরা এখনও সেটা পুরোপুরি স্পর্শ করতে পারি না! নিজের অন্তরের ‘মনের মানুষ’ চিনবার কথা বলে! আমরা খুবই ক্ষুদ্র এই সৃষ্টির কাছে। সেটা চিনবার কথা বলে! আমরা এর কণামাত্র উপলব্ধি করিনি! সেইপথ দিয়ে সাধনার কথা বলে!’‌
ডিজিটাল কনসার্টের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, শব্দের গুণমান বজায় রাখা। তবে এই শো–এর লাইভ মিক্সিং অসাধারণ। প্রতিটা ইন্সট্রুমেন্টের প্রতিটা লাইন খুব স্পষ্টভাবে শোনা এবং বোঝা যাচ্ছিল। কোথাও তিলমাত্র অভিযোগের জায়গা রাখতে পারছি না। শুধু মাঝেমধ্যে কোনও একটি গিটার থেকে সামান্য যান্ত্রিক ‘‌নয়েজ’‌ পাওয়া যাচ্ছিল। পাশাপাশি থেকেথেকেই এক–আধ সেকেন্ডের জন্য কালো হয়ে যাচ্ছিল স্ক্রিন। যন্ত্রের এই যন্ত্রণা নিশ্চয়ই ফকিরা পরের কনসার্টের আগে শুধরে নেবে।

রিভিউ: ভক্তের চোখে ফকিরার ডিজিটাল কনসার্ট: প্রিয়ম সেনগুপ্ত


এখনই শেয়ার করুন

One thought on “রিভিউ: ভক্তের চোখে ফকিরার ডিজিটাল কনসার্ট: প্রিয়ম সেনগুপ্ত

  • July 29, 2020 at 7:18 am
    Permalink

    অসাধারণ

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *